জাভেদের বেড়ে ওঠার গল্প, লক্ষ্য তাঁর জাতীয় দল জাভেদের বেড়ে ওঠার গল্প, লক্ষ্য তাঁর জাতীয় দল – SportsTour24

মোহাম্মদ আফজাল :: বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের হয়ে খেলছেন সিলেটের অনেক ক্রিকেটার। শুরুর সেই শফিকুল হক হীরা থেকে এই সময়ের জাকির, রাহী, আর সর্বশেষ খালেদ। একসময় জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন সিলেটের রাজিন সালেহ। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট হ্যাটট্রিকম্যান সিলেটের ছেলে অলক কাপালী। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের নায়ক এনামুল হক জুনিয়রও সিলেটের।

 

সিলেটের ক্রিকেটারদের অবদান বাংলাদেশের ক্রিকেটে উজ্জ্বল। জাতীয় দলে খেলা এসব তারকাদের দেখেই বেড়ে উঠেছেন সিলেট মহানগরীর বাগবাড়ি এলাকার বাসিন্দা রাহাতুল ফেরদৌস জাভেদ। সিলেটের অলক কাপালীকে ‘আইকন’ মেনে ক্রিকেটে আসা জাভেদ খেলেছেন বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক সব দলের হয়ে। স্কুল ক্রিকেট দিয়ে প্রতিযোগিতামূল ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করেন জাভেদ ২০০৭ সালে। পরিবারের বাধাকে জয় করে জাভেদ খেলেছেন বাংলাদেশ ইমার্জিং দলের হয়েও। এখন তাঁর লক্ষ্য জাতীয় দল।

 

নিজের ক্রিকেটার হওয়া, ক্রিকেটে পথচলার গল্প স্পোর্টসট্যুর২৪ডটকম’কে শুনিয়েছেন রাহাতুল ফেরদৌস জাভেদ।

 

২০০৭ সালে সিলেটের ব্লু বার্ড স্কুলের হয়ে ক্রিকেটে পথচলা শুরু করেন জাভেদ। বাসায় কাউকে না জানিয়ে তিনি অনুশীলন করতেন লুকিয়ে লুকিয়ে। সেবার স্কুল ক্রিকেট প্রতিযোগিতার জন্য অনুশীলন করে ব্লু বার্ড স্কুল দলে সুযোগ পান জাভেদ। সেই খবর পরিবারের সদস্যদের যখন জানান, তখন তাঁরা এক শর্তে রাজি হন- ‘এইবার খেলে আর খেলতে পারবা না।’

কিন্তু স্কুল ক্রিকেট খেলতে গিয়ে নিজের অভিষেক ম্যাচে জাভেদ সিলেট জেলা দলের সাবেক কোচ মারুফ হাসানের নজড় কাড়েন। সেই ম্যাচে আম্পায়ারে দায়িত্ব পালন করছিলেন মারুফ হাসান। প্রচলিত কথা- ক্রিকেটারদের সবচেয়ে বেশি কাছ থেকে দেখেন আম্পায়াররা, তাঁরা বলতে পারবেন কোন ক্রিকেটার কেমন পারফর্ম করবে। তাই হয়তো সেদিন তিনি জাভেদকে চিনতে ভুল করেন নি, তাঁর মাঝে হয়তো প্রতিভার ঝলক দেখেছিলেন তিনি। তাই তো ম্যাচ শেষে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘অনূর্ধ্ব-১৪ জেলা দলের ক্যাম্প হবে, তুমি এসো ক্যাম্পে’।

 

জাভেদ স্কুল ক্রিকেট খেলেতে গিয়েছিলেন ‘এইবার খেলে আর খেলতে পারবেন না’, পরিবারের এই অনুমতি নিয়ে। কিন্তু সেই স্কুল ক্রিকেটই তাঁকে ক্রিকেট ক্যারিয়ারের পথ দেখিয়ে দিল। সেখান থেকেই শুরু জাভেদের পুরোদস্তুর ক্রিকেটার হওয়া আর এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

 

পরিবারকে না জানিয়ে জাভেদ যান সিলেট জেলা দলের ক্যাম্পে। ক্যাম্প শেষে ডাক পেলেন সিলেট অনূর্ধ্ব-১৪ দলে। প্রথম বছর খেলতে পারেন নি নিজের পরীক্ষা ছিল বলে। পরে খেলেন সিলেট ডিভিশন অনূর্ধ্ব-১৫ দলের হয়ে। সেখানে ভালো করার ফলে ২০০৯-২০১০ সালে ডাক পান বাংলাদেশ জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৫ দলে। সেখানেই নিজের প্রতিভার সম্ভবনার কথা জানান দেন জাভেদ এবং সে বছর ডাক আসে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৭ দলে।

 

বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে দুই বছর লাল সবুজের জার্সি গায়ে খেলেন রাহাতুল ফেরদৌস জাভেদ। শুরুর দিকে পরিবার থেকে অনুমতি না পেলেও বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ দলে ডাক পাওয়ার পর একটু একটু করে ক্রিকেট খেলার পুরোপুরিভাবে অনুমতি পান জাভেদ। পাড়ার বড় ভাই এবং সিলেট ক্রিকেটাঙ্গনের অনেকে জাভেদের বাসায় গিয়ে বুঝান পরিবারের সবাইকে, ফলে তাঁরা রাজি হন ছেলেকে ক্রিকেটার বানাতে।

 

জাভেদ নিজেও সিদ্ধান্তহীনতায় ছিলেন, তিনি ক্রিকেটার হবেন কি না! অনূর্ধ্ব-১৫ দলে খেলার পরে বুঝতে পারেন, বাংলাদেশকে ক্রিকেটে অনেক কিছু দেওয়ার আছে তাঁর।

 

জাভেদ জানান, ছোটবেলায় পেপসি কিনে স্টিকার সংগ্রহ করতেন তিনি। সেখানে শহীদ আফ্রিদি এবং শোয়েব মালিকের ছবি দেখে ক্রিকেটের প্রেমে পড়েন তিনি। দেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি প্রিয় সাকিব আল হাসান; যাকে তিনি আইকন মানেন। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার ডেভিড মিলারের ব্যাটিংয়ের অন্ধভক্ত তিনি, বোলিং আবার পছন্দ ভারতের রবীন্দ্র জাদেজাকে। সিলেটের ক্রিকেটে তাঁর অলটাইম আইকন অলক কাপালী।

অনূর্ধ্ব-১৭ দল থেকে জাভেদ ডাক পান বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। বাংলাদেশ জাতীয় দলের অনেক তারকা ক্রিকেটার উঠে আসেন এই যুব দল থেকে। আজকের সাকিব, তামিম, মুশফিকরা সেই যুব দলেরই ‘সম্পদ’। ২০১৩-১৪ সালে জাভেদ বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে সিরিজ খেলেন, সেই সিরিজে ৭ ম্যাচে ১১ উইকেট লাভ করেন তিনি। সেরা বোলিং ফিগার ছিল ৫৫ রানে ৫ উইকেট। সিরিজে জাভেদ বাংলাদেশীদের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ উইকেট লাভ করেন।

 

যুব দলের গন্ডি পেরিয়ে জাভেদ খেলেছেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ দলের হয়ে। ২০১৭ সালে ইমার্জিং এশিয়া কাপে বাংলাদেশের হয়ে দুই ম্যাচে নেন ৬ উইকেট। টিম কম্বিনেশনের কারনে পরের ম্যাচগুলোতে সাইড বেঞ্চে কাটাতে হয় জাভেদকে। নেপালের বিপক্ষে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে জাভেদ ৭ ওভার বল করে ৪৫ রানের বিনিয়ময়ে ৪ উইকেট পেয়েছিলে। হংকংয়ের বিপক্ষে ইমার্জিং কাপের প্রথম ম্যাচেও জাভেদ ছিলেন সফল। সে ম্যাচে জাভেদ ৮.১ ওভারে ২৬ রান দিয়ে ২ উইকেট লাভ করেন।

 

২০১৫ সালে সিলেট বিভাগের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় রাহাতুল ফেরদৌস জাভেদের। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে জাভেদ ২৮ ম্যাচে ৪২ ইনিংসে ২৮ গড়ে রান করেছেন ৮৯৭। চার ফিফটির পাশাপাশি আছে এক সেঞ্চুরিও। অপরাজিত সেই সেঞ্চুরির ইনিংসে জাভেদ রান করেছিলেন ১০৬*।

 

বল হাতে বাঁ-হাতের স্পিন জাদুতে উইকেট নিয়েছেন ৬৮টি। ২৮ ম্যাচের ৪৪ ইনিংসে বল করে ইনিংসে পাঁচ এবং চার উইকেট পেয়েছেন দুইবার করে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে জাভেদের সেরা বোলিং ফিগার হচ্ছে ৪৮ রানে ৫ উইকেট। ফিল্ডিংয়ে তিনি ক্যাচ নিয়েছেন ২৪টি।

 

২০১৪ সালে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে অভিষেক হয় রাহাতুল ফেরদৌস জাভেদের। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে জাভেদ ৪৭ ম্যাচের ৪৫ ইনিংসে জাভেদ নিয়েছেন ৫৪টি, সেরা বোলিং ৩৬ রানে ৪ উইকেট। ব্যাটিংয়ে তেমন একটা সুবিধা করে উঠতে পারছেন না এই তরুণ লেফট আর্ম অর্থোডক্স।

 

লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ৪৭ ম্যাচে ২৭ ইনিংসে ব্যাট করে রান করেছেন মাত্র ২৬৯। তবে ফিল্ডিংয়ে ক্যাচ নিয়েছেন ২১টি। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে দুইবার খেলেছেন প্রাইম দোলেশ্বরের হয়ে। এবার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে খেলছেন ব্রাদার্স ইউনিয়নের হয়ে। আর শুরুটা মোহামেডানের হয়ে।

 

বাংলাদেশ বয়সভিত্তিক দল এবং ঘরোয়া ক্রিকেটের নিয়মিত মুখ প্রতিভাবান তরুণ ক্রিকেটার রাহাতুল ফেরদৌস জাভেদ স্বপ্ন দেখেন, জাতীয় দলের হয়ে লাল সবুজের জার্সি গায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার। বয়স এখনও ২৫। নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটার ঢের সময় তাই তাঁর সামনে।

 

জাভেদ বলেন, ‘‘বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ এবং অনূর্ধ্ব-২৩ দলের হয়ে খেলেছি, এইচপি দলেও ছিলাম। এখন শুধু বাংলাদেশ ‘এ’ দল এবং জাতীয় দলের হয়ে খেলা বাকি। নিজেকে ‘এ’ দল আর জাতীয় দলের জন্য প্রস্তুত করাই আমার লক্ষ্য। এজন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে জানি, আমি সেটা করছি।’

শেয়ার করুন :