সমর্থক কেন উগ্রতা ছড়াবে! সমর্থক কেন উগ্রতা ছড়াবে! – SportsTour24

তানজিল শাহরিয়ার ওলি :: ইশকুল জীবন থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে ক্রিকেট খুব পছন্দ করতাম। নাওয়া-খাওয়া ভুলে মাঠে, মহল্লার খোলা জায়গায় খেলা ছিলো নেশার মতো।

 

খেলা দেখার জন্যেও উতলা ছিলাম। মেডিক্যাল মাঠে খেলা হলে নিয়মিতই দেখতে যেতাম। তখন ক্যাবল সংযোগ খুব কম ছিলো, আন্তর্জাতিক ম্যাচ দেখার জন্যে মহল্লায় সবাই মিলে একসঙ্গে কারো ঘরে গিয়ে কিংবা টিভি বাইরে এনে খেলা দেখা হতো। কখনো কখনো ছুটে যেতাম সরকারি হোস্টেলের কমন রুমে।

 

খেলোয়াড়দের খবর, পোস্টার লাগানো, নিজেদের মধ্যে কে সেরা ক্রিকেটার, খেলোয়াড় তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক লেগেই থাকতো। ছোট-বড় সকলেই এসব বিষয় খুব উপভোগ করতো।

 

আমার প্রথম ক্রিকেট আইডল ছিলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। আশ্চর্য হলেও সত্য সে সময় বিটিভিতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিভিন্ন খেলার সরাসরি সম্প্রচার করা হতো। সে সুবাদেই বুলবুলকে দেখা, ভক্ত বনে যাওয়া। উনি মোহামেডানে প্রায় নিয়মিতই খেলতেন। ফলে শৈশবের প্রিয় ক্লাব আর পছন্দের খেলোয়াড়-এক বিন্দুতেই যেন মিলে গিয়েছিলো আনন্দের উৎস।

 

আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যার ব্যাটিং দেখে মনে হয়েছিলো ব্যাটিং খুব সহজ আর শৈল্পিক, তিনি হলেন অজি ক্রিকেটার মার্ক ওয়াহ। যার খেলা তন্ময় হয়ে দেখতাম।

 

আরো অনেক খেলোয়াড়কে ভালো লাগতো। কিন্তু আইডল ছিলেন ওই দুইজনই। পরে ড্যামিয়েন মার্টিনকে দেখতেও অনেক ভালো লাগতো। চাপের মধ্যেও সাবলীল ব্যাটিং করাটা তিনি অভ্যাসে পরিণত করেছিলেন।

 

ফুটবল, টেনিস, অ্যাথলেটিক্স ইত্যাদি খেলাও নিয়মিত দেখা হতো। অনেক খেলোয়াড়কে ভালো লাগতো। আড্ডায় তাঁদের নিয়েও কতো তর্ক-বিতর্ক হতো!

 

খেলা আর খেলোয়াড়কে খেলাধুলার গণ্ডির বাইরে নিয়ে আসিনি। কোনো খেলোয়াড়কে ব্যক্তিগত জীবনে ‘আদর্শ’ হিসেবে অনুসরণ করিনি। হ্যাঁ, কারো গুণ ভালো লাগলে তা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু, অমুকের মত হতে হবে এভাবে ভাবিনি কখনো।

 

অনেক খেলোয়াড়ের মাঠের নৈপূণ্য আর মাঠের বাইরের জীবন বিপরীতমুখী। এমনকি অসামাজিক, আইন বিরোধী কর্মকান্ডেও যুক্ত খেলোয়াড় ছিলেন। বহুগামি, নারী নির্যাতন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণ-অনেক ঘটনার জন্ম দিয়েছেন বহু রথি-মহারথি।

 

আমি একজনের খেলা দেখার সময় তার খেলার দক্ষতাটাই দেখি। মাঠে তার যা দায়িত্ব সেটা খেলোয়াড়টি কতোখানি পালন করছেন, সেটা বিবেচ্য।

 

সামাজিক জীবন নিয়ে কথা বলা যাবে না, তা নয়। তবে, সেটা খেলার সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলে আলাদা করে আলোচনা উত্তম বলে মনে করি।

 

কেউ খেলোয়াড়ি জীবন, ব্যক্তিগত জীবন দু’টোকেই সমানভাবে আদর্শিক দিক থেকে সামলে নিতে পারলে তিনি খেলোয়াড় এবং মানুষ হিসেবে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করেন। সবসময় শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে থাকেন। এ নিয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই।

 

দেশে ভক্তদের হালচাল অশোভন। ব্যক্তিগত পছন্দকে গায়ের জোরে চাপিয়ে দেয়া, বিরোধী পক্ষকে অশ্রাব্য ভাষায় আক্রমণ করা, খেলাধুলার চেতনা সম্বন্ধে অজ্ঞতা, অসচেতনতা ইত্যাদি এখন নিয়মিত প্রতিক্রিয়ার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা প্রায়ই সামাজিকতা বিনষ্ট করছে। অশ্লীলতার প্রচারক হয়ে উঠছে।

 

খেলাধুলায় যুক্ত হবার পূর্বে মনমানসিকতা উন্নতি সাধন আবশ্যক। সংকুচিত মনোভাব নিয়ে এ অঙ্গনে প্রবেশ করলে পরিবেশ দূষিত হয়। এসব নিয়ে সচেতনতা অতি অল্প। এসব শোনার আগ্রহ কারো নাই বললেই চলে।

 

বিভিন্ন সমর্থক গোষ্ঠী নিজেদের পছন্দের খেলোয়াড়কে নিয়ে সমালোচনার জবাব খুব কদর্যভাবে দিয়ে থাকে। কয়েক বছর আগে এদেশের একজন পরিচিত ক্রিকেট ভক্ত বাংলাদেশ দলপতিকে নিয়ে ভারতের কিংবদন্তি সুনীল গাভাস্কারের করা মন্তব্যের বিপরীতে তাঁকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে যেভাবে লিখেছিলেন, তাতে উনি কতটুকু ‘স্পোর্টিং’ আর কতখানি ক্রীড়াসুলভ মানসিকতা ধারণ করেন তা বোঝা গেছে। এই রকম ভক্ত, সমর্থকই এখন বেশি। ভক্ত-সমর্থকের নামে উগ্রতার ছড়াছড়ি দেখা যায় অহরহ।

 

এই প্রবণতা কবে থামবে, কে জানে!

 

শুরুতেই শৈশব, কৈশোরে খেলাধুলা বিষয়ক স্মৃতিকথা লিখেছি, ওই সময় আমরা খেলার আনন্দেই খেলতাম, খেলা দেখতাম, সমর্থন করতাম। কিন্তু, সময়ের বিবর্তনে আজকাল যেন সমর্থকেরা ‘লাভ-ক্ষতির’ হিসাব কষে খেলা দেখতে বসেন। বিরোধী পক্ষকে দুই কথা শুনিয়ে বা কমেন্ট করে বিকৃত আমোদ লাভ করেন।

 

ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতন না হলে এই নিম্নরুচি প্রসূত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তন সম্ভব নয়। এসব অসংলগ্ন আচরণ ক্রীড়াঙ্গনকে কলুষিত করবে। পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে। এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।

 

*লেখক: ক্রিকেট আম্পায়ার, ক্রীড়া বিশ্লেষক।

শেয়ার করুন :