ন্যয়ার গোলরক্ষক, ন্যয়ার ডিফেন্ডার! ন্যয়ার গোলরক্ষক, ন্যয়ার ডিফেন্ডার! – SportsTour24

মান্না চৌধুরী :: গোলের খেলা ফুটবল। গোল হলেই খুশি সবাই। ওপরের দিকে যারা খেলেন তাঁরাই মূলত ৯০ মিনিটের খেলায় থাকেন আকর্ষণের কেন্দ্রে। কিন্তু গোল আটকানোও যে কখনো কখনো শিল্পে রূপ নেয়। কাল রাতে উয়েফা সুপার কাপের ফাইনালে এমনই এক প্রদর্শনী দেখলো বিশ্ব। একদিকে বিখ্যাত ম্যানুয়েল ন্যয়ার, অন্যদিকে অখ্যাত ইয়াসিন বুনো। দুই গোলরক্ষের স্নায়ুর লড়াই শুরু থেকে। মৌসুমের শেষ ট্রফি ঘরে তুলতে মরিয়া জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখ আর স্পেনের সেভিয়া।

 

একের পর এক আক্রমণ। এই বায়ার্নের সীমানায় বল তো একটু পরেই সেভিয়ার রক্ষণ আর গোলরক্ষকের কঠিন পরীক্ষা। ২২ জনের খেলায় বারবার দুটি মুখ টিভি ক্যামেরায়, ন্যয়ার আর বুনো। ম্যানুয়েল ন্যুয়ারের প্রতিরোধ কিন্তু ঠেকলো প্রথম হাফের ১৩ মিনিট পর্যন্ত। অবশ্য এখানে তাঁর কোন দায় নেই। সেভিয়ার পরিকল্পিত এক আক্রমণ ঠেকাতে বক্সের মধ্যে ফাউল করে বসেন বায়ার্নের এক ডিফেন্ডার। পেনাল্টি সেভ কত কঠিন সেটা জানেন ন্যয়ার। তবুও চেষ্টা ছিল, কিন্তু সেভিয়ার ওকম্পোস সুযোগ দিলেন না। জাল কাঁপালেন বায়ার্নের। কাল রাতটা যেন অন্যকিছুরই পূর্বাভাস দিচ্ছিল। ম্যাচের আগে জরিপ হলে সেভিয়ার পক্ষে একটি ভোটও পড়তো কিনা সন্দেহ। আট গোলের মালা পরানো যাদের কাছে সহজ কাজ সেই বায়ার্নকে কাঁপিয়ে দিবে সেভিয়া কল্পনা করাও তো কঠিন।

 

তবে ইউরোপা লিগ চ্যাম্পিয়ন দলটি পুরো ম্যাচজুড়েই লড়েছে সমানতালে। দেখে মনে হয়নি তাঁদের প্রতিপক্ষ চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ী বায়ার্ন মিউনিখ, যেন ইউরোপা লিগেরই কোন দল খেলছে! এভাবে অবাক করে করে বুদাপেস্টের পুসকাস অ্যারেনায় ১৩ মিনিটেই এগিয়ে যাওয়া। আচমকা পিছিয়ে পড়া বায়ার্ন আক্রমণের ধার বাড়ায়। যাদের কাছে গোল দেয়াই পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ সেই লেভানডোভস্কি, টমাস মুলাররা বারবার ব্যর্থ। তাঁদের ব্যর্থতার চেয়ে আসলে সেভিয়া গোলকিপার ইয়াসিন বুনোর মরিয়া প্রচেষ্টাই ফুটে ওঠে। ম্যাচের শুরুতে একবার ভুল করে বিপদ ডেকে এনেছিলেন। এরপর থেকে আস্থায় অবিচল মরোক্কান গোলরক্ষক। কখনো ডান দিকে, কখনোবা বাঁদিকে শরীরকে সমর্পণ করে, আবার শূন্যে লাফিয়ে উঠেও সেভিয়াকে বাঁচিয়েছেন বুনো।

 

৩৪ মিনিটে অবশ্য ভেঙে যায় প্রতিরোধ। লেয়ন গোরেটস্কা সমতায় ফেরান জার্মান জায়ান্টকে। ১-১ সমতায় শেষ হয় প্রথমার্ধ্বের লড়াই। পরের ৪৫ মিনিটেও দুই দলের জয়ের তীব্র নেশা। বল দখলে কিছুটা পিছিয়ে থাকা সেভিয়া কাউন্টার অ্যাটাকে বারবার ভীতি ছড়ায় বায়ার্নের রক্ষণে। কিন্তু আলাভা, পাভার্ডদের পেছনে যে একজন আছেন শেষ ভরসা হিসেবে। হাতে গ্লাভস, গোলরক্ষকই তাঁর পরিচয়। কিন্তু গোলপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে ওভারটাইম কাজের মতোই বাড়তি একটা দায়িত্বও পালন করেন ম্যানুয়েল ন্যয়ার। পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসেন প্রায়ই। বক্সের বাইরে থেকেও বল জোগান দেন সতীর্থদের।

 

মানে বায়ার্ন যদি চার ডিফেন্ডার নিয়ে খেলে তবে ন্যয়ার মিলে হয়ে যায় পাঁচ! কাল রাতেও শ্রমিকের খাটুনিতে নিজেরটার পাশাপাশি আলাভা, বুয়াটেংদের কাজও করেছেন! আর নির্ধারিত সময়ের শেষে এসে যা করলেন তা তো বিস্ময়কেও ছাড়িয়ে যায়। মাঝমাঠ থেকে বাড়ানো বল ধরে বায়ার্নের বক্সে ঢুকে পড়েছেন ইউসেফ এন নেসিরি। তাঁর সামনে কেবল বায়ার্ন গোলরক্ষক৷ শুধু বলটা ঠেলে দিলেই হয়। নেসিরি প্লেসিং করেছেনও। কিন্তু ম্যানুয়েল ন্যয়ার যেন জানতেন বলের গতিপথ। ডানদিকে শূন্যে শরীর ভাসিয়ে হাতটা লাগালেন শুধু, সাইডপোস্টের পাশ ঘেঁষে বল বাইরে! গ্যালারিতে থাকা কিছু সেভিয়া সমর্থকের বিশ্বাস হয় না, বিশ্বাস হয় না বায়ার্ন সমর্থক আর নায়ক হতে যাওয়া ইউসেফ এন নেসিরিরও!

 

কিন্তু অবিশ্বাস্য কাজ করেও ন্যয়ার যেন স্বাভাবিক। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের জন্য দলকে উজ্জীবিত করলেন। নেতা হিসেবে সবাইকে হয়তো বলেছেন, আমরা হারতে জানি না, জিততেই হবে। অধিনায়কের অনুপ্রেরণায়ই কিনা ১০৪ মিনিটে বদলি হিসেবে নামা জাভি মার্টিনেজের গোল। বাকি সময়টা নিজের জাল অক্ষত রেখেই বায়ার্নকে উপহার দিলেন মৌসুমের চতুর্থ শিরোপা! তারচেয়েও বড় কথা অনেকদিন ধরেই অপরাজিত জার্মান ফুটবল শক্তি। এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষের নাম কি? উত্তরটা তো সহজই! বিশ্বের এক নম্বর গোলরক্ষক ম্যানুয়েল ন্যয়ার।

শেয়ার করুন :