ইফতেখার নাইমের ক্রিকেটে আসার গল্প, ফিরতে চান লিগ দিয়ে ইফতেখার নাইমের ক্রিকেটে আসার গল্প, ফিরতে চান লিগ দিয়ে – SportsTour24

মোহাম্মদ আফজাল :: ইফতেখার নাইম আদীব বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের এক সময়ের নিয়মিত খেলোয়াড় ছিলেন। দেশের বয়সভিত্তিক দলের গন্ডি পেরিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলেছেন নিজ বিভাগ বরিশালের হয়ে। মা-বাবার তিন ছেলের মেজো ছেলে আদীব, বড় ভাই শাহরিয়ার নাফীস বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘদিন খেলেছেন। বাংলাদেশ জাতীয় দলের প্রথম-টি-টোয়েন্টি অধিনায়কও ছিলেন শাহরিয়ার নাফীস। ছোট ভাই ইকতেদার নাজীফ আকীবও খেলেছেন বাংলাদেশ বয়সভিত্তিক সব দলে, ছিলেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ দলের অধিনায়কও।

 

বড় ভাই শাহরিয়ার নাফীস আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেও ছোট ভাই আদীব ও আকীব তার আগেই ক্রিকেট ছেড়ে আমেরিকায় চলে যান। ক্রিকেট ছেড়ে আমেরিকা চলে যাওয়ার কারণ, নিজের ক্রিকেট প্রেম আর ক্রিকেট নিয়ে ভবিষ্যত ভাবনার কথা স্পোর্টসট্যুর২৪ডটকমকে জানিয়েছেন ইফতেখার নাইম আহমেদ আদীব।

 

আদীব কী বড় ভাই শাহরিয়ার নাফীসকে দেখে ক্রিকেটে এসেছিলেন? নাকি অন্য কেউ ছিলেন তাঁর ক্রিকেটে আসার রোল মডেল?
শাহরিয়ার নাফীস নন, তবে তাঁর সাথেই ক্রিকেট খেলা শুরু করেন আদীব। আদীব বলেন, ‘ভাইকে দেখে নয়, বলতে পারেন ভাইয়ের সঙ্গেই। ১৯৯৩ সালের দিকে হবে। খালাতো ভাই ফারুক আহমেদ (সাবেক প্রধান নির্বাচক) তখন জাতীয় দলে খেলেন। প্র্যাকটিসের জন্য বাসার ছাদে নেট লাগিয়েছিলেন ফারুক ভাই। ওখানেই আমার আর ভাইয়ার শুরু।’

 

১৯৯৫ সালে শাহরিয়ার নাফীস ধানমন্ডি মাঠে কোচ ওয়াহিদুল গণির অধীনে ক্রিকেট কোচিংয়ে ভর্তি হন। শাহরিয়ার নাফীসকে প্রতিদিন অনুশীলনে নিয়ে যেতেন তাঁর মা, মায়ের সাথে ভাইয়ের অনুশীলন দেখতে যেতেন আদীবও। আর তাতেই ওয়াহিদুল গণির চোখে পড়েন তিনি। তাঁর মাকে পরামর্শ দেন, আদীবকেও ভর্তি করিয়ে দেওয়ার।


আদীব বলছিলেন, ‘ভাইয়া ধানমন্ডি মাঠে ওয়াহিদ স্যারের কাছে কোচিং নেওয়া শুরু করে। আমিও ভাইয়ার সঙ্গে মাঠে যেতাম। একদিন স্যার বললেন, তুমিও শুরু করো। সেই শুরু। মা আমাদের মাঠে নিয়ে যেতেন, পুরো সময় বসে থাকতেন। সকালে খেলা থাকলে বাবা নিয়ে যেতেন।’

 

এ প্রসঙ্গে তাঁর মা সালমা আঞ্জুম লতা বলেন, ‘আবীর (শাহরিয়ার নাফীস) মাঠে যেত, তাকে দেখে আদীবও মাঠে যেতে চাইত। আমি তখন দুজনকেই মাঠে নিয়ে যেতাম। আবীর ১৯৯৫ সালে খেলা শুরু করে আর আদীব ৯৬ সালে। আবীরকে দেখেই সে ক্রিকেটে আসে।’

 

বড় ভাই শাহরিয়ার নাফীসের আগেই বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক দলে ডাক পান আদীব। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৩ দলে সুযোগ পান তিনি। ১৯৯৯-২০০০ সালে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৩ দলের অধিনায়ক ছিলেন। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৩ দলের হয়ে শিরোপাও জিতেছিলেন তিনি। যা তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ারের স্মরণীয় স্মৃতি হিসেবে দেখেন।

২০০৭ সালে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ডাক পান আদীব। সে বছর জুলাই মাসে অনূর্ধ্ব-১৯ দল শ্রীলঙ্কা সফরে যায়। শ্রীলঙ্কা অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিপক্ষে দুটি যুব টেস্ট এবং চারটি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছিলেন তিনি। দুই টেস্টের চার ইনিংসে এক হাফ সেঞ্চুরিতে রান করেছিলেন ১০২। যখন যুব বিশ্বকাপ ২০০৮ এর জন্য বাংলাদেশের দল ঘোষণা করা হয়েছিল, সেই দলে তাকে রাখা হয়নি। মূল দলে ডাক না পেলেও, ছিলেন স্ট্যান্ডবাই প্লেয়ারদের সংক্ষিপ্ত তালিকায়। কোনো একজন ইনজুরিতে পড়লে থাকে ডাকা হতো। তবে তাকে না ডেকে ডাকা হয়েছিল সেই তালিকায় থাকা অন্য ক্রিকেটারকে।

 

দারুণ সম্ভবনাময় ক্রিকেটার ছিলেন আদীব। ক্রিকেটের এক ‘ফুল প্যাকেজ’ বলা যায়। ব্যাটিং, বোলিং, উইকেটকিপিংসহ সব কিছুতেই পারদর্শী ছিলেন তিনি। ব্যাটিং ও কিপিংয়ের সঙ্গে স্লো মিডিয়াম ফাস্ট বোলিং করতেন। আদীব দারুণ মেধাবী ক্রিকেটার ছিলেন বলে মনে করেন বড় ভাই শাহরিয়ার নাফীসও।

 

নাফীস বলেন, ‘আদীব ব্যাটিং করতে পারত, বোলিং করতে পারত, সে একজন ভাল উইকেটকিপারও ছিল। এমন সম্ভবনাময় ক্রিকেটার খুব কমই পাওয়া যায় আমাদের দেশে। যদিও সে তার প্রতিভা পরবর্তীতে বিকশিত করতে পারেনি। সে জ্ঞানী ক্রিকেটার ছিল, ম্যাচ রিড করার ক্ষমতা ছিল অনেক বেশি। খেলা বুঝত, ম্যাচের পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তার ছিল। গেম বিশ্লেষণ করার দারুণ ক্ষমতা ছিল তার।’

ইফতেখার নাইম আহমেদ আদীব বয়সভিত্তিক দলে খেলেছেন নাসির হোসেন, রুবেল হোসেনদের সাথে। খুব অল্প বয়সেই নজর কাড়েন নির্বাচকদের। বরিশাল বিভাগের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ২০০৭ সালে সিলেটের বিপক্ষে অভিষেক হয় তাঁর। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দুই সেঞ্চুরি ও চার হাফ সেঞ্চুরিতে ২৮ ম্যাচে রান করেছেন ১৩৬৭। এই রান করতে ব্যাট হাতে ১৮৭টি চার আর ৯টি ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন আদীব। ফিল্ডিংয়েও ছিলেন দারুণ, তালুবন্দী করেছিলেন ৩৪টি ক্যাচ। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের মত লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেট এতোটা দীর্ঘ হয়নি তাঁর। লিস্ট ‘এ’তে ম্যাচ খেলেছেন মাত্র ১৩টি, রান করেছেন ২৩১। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) বরিশাল বার্নার্সের স্কোয়াডে থাকলেও ম্যাচ খেলার সুযোগ পান নি।

 

ক্রিকেট এবং পড়াশোনা দুটোতেই ভালো ছিলেন তিনি। স্কলাস্টিকা থেকে ‘ও’ লেভেল, মাস্টারমাইন্ড থেকে ‘এ’ লেভেল শেষ করে তিনি আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে বিবিএ পড়েছিলেন। ২০১৩ সালে ক্লেমন ইনডোর উইনি ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের হয়ে ম্যান অব দ্য ফাইনাল নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেবার আদীবের ব্যাট-বলের দারুণ পারফর্মেন্সে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়। ক্লেমন ইনডোর ইউনি ক্রিকেটের দ্বিতীয় আসরে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের হয়ে তিনি সর্বোচ্চ ২৯৩ রান ও ৪ উইকেট শিকার করে টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার জিতেছিলেন।

 

ক্রিকেটে যখন আশানুরূপ পারফর্ম্যান্স করতে পারছিলেন না, তখন পড়ালেখাতেই নিজের ভবিষ্যত দেখছিলেন আদীব। দেশের ক্রিকেট ছেড়ে ২০১৪ সালের মে মাসে পাড়ি দেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে স্নাতক শেষ করে চাকরি করছেন, পাশাপাশি খেলছেনও। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম দিকে ক্রিকেট খেলার জন্য এক শহর থেকে আরেক শহরে ছুটে যেতেন। কারণ দেশ ছেড়ে বিদেশে গেলেও ক্রিকেট ছাড়তে পারছিলেন না কোনো ভাবেই। ছাড়বেনইবা কীভাবে! ক্রিকেট যে তাঁর রক্তেমাখা।

 

যুক্তরাষ্ট্রের এরিজোনা স্টেট লিগে খেলছেন আদীব। সেখানে ব্যাট হাতে রীতিমতো ঝড় তুলছেন এই ক্রিকেটার। এরিজোনা এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশী ক্রিকেটার্স আয়োজিত মুরাদ-রানা স্মৃতি টি-২০’তে ক্রিকেট লিগের তিন আসরে ১১ ম্যাচে ১০ ইনিংসে রান করেছেন ৫৫৫। সর্বোচ্চ ১৭৮ রানের একটি ইনিংস আছে তাঁর, এই রান করতে বল খেলেছিলেন মাত্র ৯৯টি। এক সেঞ্চুরির পাশাপাশি আছে ২ হাফ সেঞ্চুরিও।

 

এই টুর্নামেন্টের ওয়ানডে সংস্করণে ৮ ম্যাচে করেছেন ৪৩১ রান। সর্ব্বোচ ১২০ রান। তিন সেঞ্চুরির সাথে আছে এক হাফ সেঞ্চুরি। ক্রিকক্লাবস ডটকমের পরিসংখ্যান বলছে, তিনি এরিজোনা এসোসিয়েশন ক্রিকেট লিগে ৭৬টি ওয়ানডেতে ৭০ ইনিংসে রান করেছেন ২২৮৯। সর্বোচ্চ ১৬২ রানের ইনিংস খেলেছিলেন, ৬ সেঞ্চুরির সাথে ৮টি হাফ সেঞ্চুরি। বল হাতে ৭৬ ম্যাচে ৬৩ ইনিংসে তাঁর স্বীকার ১০০ উইকেট। টি-২০’তে ব্যাট হাতে ১৮ ম্যাচে রান করেছেন ৬০১। সর্ব্বোচ ৯১ রানের ইনিংসের সাথে আছে পাঁচ ফিফটি।

 

যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিকেটারদের একটা ক্যাম্প হয়, যেখানে বিভিন্ন স্টেট থেকে খেলোয়াড়দের নেওয়া হয়। গত বছর সেখানেও তিনি ডাক পেয়েছিলেন। ৪০ জনের প্রাথমিক দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন, সেখানে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং ভারতীয় ক্রিকেটারদের আধিপত্য বেশি।

 

খেলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রে মূল দলে জায়গা করে নিতে পারবেন বলে মনে করেন তাঁর বড় ভাই শাহরিয়ার নাফীস। কিন্তু আদীব ভাবছেন ভিন্ন কিছু। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফিরে আসবেন দেশে, এখানে চাকরি করার পাশাপাশি ক্রিকেটটাও আবার চালিয়ে যাবেন। দেশের ক্রিকেট অনেক মিস করেন তিনি, ঢাকা প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগ দিয়ে শুরু করতে চান এবং নিজ বিভাগ বরিশালের হয়ে খেলতে চান জাতীয় লিগে।

 

এ প্রসঙ্গে ইফতেখার নাইম আদীব বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলাম পড়াশোনা করার জন্য, পড়াশোনা শেষ করে এখন চাকরি করছি। সপ্তাহিক ছুটির দিনে ক্রিকেট খেলি। এখানে আসার পরে সবার স্বপ্ন থাকে গ্রিন কার্ড পাওয়ার, আমি সেটা পেয়েছি। বিশ্বের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দেশে ফিরে আসব। দেশে চাকরি করার সাথে সাথে আবার ক্রিকেট খেলা শুরু করব। ঢাকা প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগ দিয়ে শুরু করব, এখানে ভালো খেলে জাতীয় ক্রিকেট লিগে বরিশাল দলে নিজের জায়গা নিশ্চিত করার চেষ্টা করব।’

বড় ভাই শাহরিয়ার নাফীস চান আদীব যেখানেই থাকুক সবসময় ভালো থাকুক এবং ক্রিকেটের সাথেই থাকুক, ‘ক্রিকেট ছাড়া সে থাকতে পারবে না, কারণ ক্রিকেট আমাদের রক্তে মিশে আছে।

 

দেশে ফিরে আবারও ক্রিকেটে ফিরবেন আদীব এ কথা শুনে খুশি শাহরিয়ার নাফীস, ‘আদীবের ক্রিকেট ক্যারিয়ার নিয়ে আফসোস আছে, সে দেশে থাকলে জাতীয় দলে খেলতে পারত কি না জানি না। তবে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালোভাবেই খেলতে পারত। তার ক্রিকেট জ্ঞানে উপকৃত হতে পারত দেশের তরুণ ক্রিকেটাররা। জাতীয় দলে তো আর সবাই খেলার সুযোগ পায় না, ১৫-১৬ জনের সুযোগ হয় খেলার। বাকিরা দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলে যায়। এখানে তার ক্রিকেট জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করলে লাভবান হবে দেশের তরুণ ক্রিকেটাররা।’

 

‘ঘরোয়া ক্রিকেটে আমার অনেক বড় বড় জুটি আছে তার সাথে। ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে কীভাবে মাথা ঠান্ডা করে খেলতে হয় তা সে ভালো জানে। সে খুব মেধাবী ক্রিকেটার ছিল। সে যদি আবারও দেশে এসে ক্রিকেট খেলা শুরু করতে চায়, আমি থাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।’

শেয়ার করুন :