‘অভিশপ্ত’ দিনের শেষে সাকিব ‘অভিশপ্ত’ দিনের শেষে সাকিব – SportsTour24

রফিকুল ইসলাম কামাল :: যে কাজটা কারো ধ্যানজ্ঞান, পেশা, খ্যাতির মূল; সেই কাজ না করতে তাকে যখন বাধ্য করা হয়, তখন বিতৃষ্ণায় ছেয়ে যাবে তার অন্তর, মনের গহীনে বইবে হাহাকারের যাতনা। নিশ্চিতভাবেই! সাকিব আল হাসানকেও এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তাকে জিজ্ঞেস না করেই বলে দেওয়া যায়।

 

এও বলা বাহুল্যতা হবে না, ক্রিকেটই যার ধ্যানজ্ঞান, সেই ক্রিকেট থেকে দীর্ঘ এক বছর বাইরে থাকা সাকিবের জন্য অনেক কষ্টের আর মর্মবেদনার ছিল। বাংলাদেশকে মাঠে নামতে দেখেছেন, কিন্তু খেলা তো দূরে থাক, মাঠের মধ্যেই তার প্রবেশ নিষিদ্ধ! সতীর্থরা সেঞ্চুরির উল্লাসে মেতেছেন, তিনি টিভির পর্দায় কিংবা ভার্চুয়াল মাধ্যমে সেই তথ্য জেনে হয়তো দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছেন, ‘খেলতে পারলে আমিও হয়তো আরেকটি সেঞ্চুরি…’!

 

সাকিবের এই দীর্ঘশ্বাসের দিন, এই ক্রিকেটহীনতার দিন, ধ্যানজ্ঞান থেকে দূরে থাকার দিন শেষ হচ্ছে আজ। গেল বছরের ২৯ অক্টোবর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)-এর নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে যে ‘অভিশপ্ত’ দিনের শুরু, আজ এর শেষ।

 

কাল থেকে সাকিব মুক্ত। কাল থেকে সাকিব স্বাধীন!

 

যেভাবে নিষিদ্ধ সাকিব
আন্তর্জাতিক দুটি ম্যাচ ও আইপিএলের একটি ম্যাচে জুয়াড়ির কাছ থেকে ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। কিন্তু সেই প্রস্তাবের তথ্য তিনি জানান নি আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগ (আকুস)-কে।

 

২০১৮ সালে শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়েকে নিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজের আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ। ওই সময়ই দুটি ম্যাচে ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব আসে সাকিবের কাছে। ১৯ জানুয়ারি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচের আগে এবং ২৩ জানুয়ারি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচের আগে প্রস্তাব পান তিনি।

 

একই বছরের ২৬ এপ্রিল আইপিএলে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ ও কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব ম্যাচে গড়াপেটার প্রস্তাব পান এই অলরাউন্ডার।

 

দীপক আগরওয়াল নামের ভারতীয় এক বাজিকর সাকিবকে এসব ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার সঙ্গে তিনবার সাকিবের যোগাযোগের প্রমাণ পায় আইসিসি।

 

সাকিব বাজিকরের প্রস্তাব পেয়ে তাতে রাজি হননি। কিন্তু তিনি প্রস্তাব পাওয়ার বিষয়টি আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিটকে (আকসু) না জানিয়ে বিপদের মুখে পড়েন। ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়েও তা না জানানো আইসিসির দুর্নীতি দমন আইনের ২.৪. ৪ ধারা ভঙ্গের সামিল।

 

আকসু সাকিবকে গেল বছরের ২৩ জানুয়ারি ও ২৭ আগস্ট দুই দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করে। নিজের ভুল স্বীকার করেন এই বাঁহাতি। এরপর ওই বছরের ২৯ অক্টোবর তাকে দুই বছরের জন্য ক্রিকেটীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করে আইসিসি।

 

তবে দ্বিতীয় বছর ছিল স্থগিত নিষেধাজ্ঞা। নিয়ম অনুসারে, প্রথম বছর সাকিব যদি আর কোনো আইন না ভাঙেন, তবে দ্বিতীয় বছরের শাস্তি পেতে হবে না।

 

গেল এক বছরে সাকিব আল হাসান আইসিসির কোনো নিয়মের ব্যত্যয় ঘটান নি। ফলে দ্বিতীয় বছরের শাস্তি থেকে তিনি মুক্তি পাচ্ছেন।

 

৩৬ নয়, ১৪ মিস সাকিবের
সাকিব যে এক বছর ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ ছিলেন, এ সময়ে আইসিসির ফিউচার ট্যুর প্ল্যান (এফটিপি) অনুসারে টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে বাংলাদেশের ম্যাচ খেলার কথা ছিল ৩৬টি।

 

কিন্তু হুট করে আসা এক মহামারির ঝড়ে থেমে যায় ক্রিকেটের গতি। গেল মধ্য মার্চের পর থেকে আর একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচও খেলেনি বাংলাদেশ।

 

তাতেই সাকিব ৩৬ ম্যাচের বদলে লাল-সবুজের জার্সি গায়ে মিস করেছেন ১৪টি ম্যাচ। এর মধ্যে ছিল ৪টি টেস্ট ম্যাচ, ৩টি ওয়ানডে এবং ৭টি টি-টোয়েন্টি।

 

টেস্ট ম্যাচগুলোর মধ্যে দুটি ছিল ভারতের বিপক্ষে, তাদের মাটিতে গেল নভেম্বরে খেলেছিল বাংলাদেশ। ফলাফল ছিল মুমিনুল হকদের জন্য বিভীষিকাময়।

 

এরপর ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানে গিয়ে একমাত্র টেস্টে নাকানিচুবানি খেতে হয় তামিম-মুশফিকদের। ওই মাসের শেষ দিকে ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়েকে একমাত্র টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে হারায় বাংলাদেশ।

 

গেল মার্চের ১, ৩ ও ৬ তারিখ সিলেটে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলে বাংলাদেশ। মাশরাফির দল হোয়াইটওয়াশ করে সফরকারীদের। সাকিব না থাকা ওই সিরিজেই নিজের অধিনায়কত্বের ইতি টেনে দেন মাশরাফি।

 

সাকিব না থাকার দিনে বাংলাদেশ ভারতের বিপক্ষে গেল নভেম্বরে ৩টি টি-টোয়েন্টি খেলে। প্রথমটিতে জয়ী হওয়া মাহমুদউল্লাহরা পরের দুটিতে হেরে যান।

 

জানুয়ারিতে বাংলাদেশ যখন পাকিস্তান সফরে যায়, খেলার কথা ছিল তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ। প্রথম দুটি মাঠে গড়ায়, বাংলাদেশ হার মানে। তবে তৃতীয়টি পরিত্যক্ত হয় বৃষ্টির কারণে।

 

মার্চে ওয়ানডে সিরিজের পর ঢাকায় টি-টোয়েন্টি সিরিজের উভয় ম্যাচে জিম্বাবুয়ে হার মানে বাংলাদেশের কাছে।

 

ঘরোয়া ক্রিকেটে সাকিব অবশ্য বঙ্গবন্ধু বিপিএল, জাতীয় লিগ মিস করেছেন। নিষেধাজ্ঞায় না থাকলে হয়তো খেলতেন ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (সিপিএল) আর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগেও (আইপিএল)।

 

সাকিবের প্রত্যাবর্তন
সবকিছু যদি ঠিক থাকতো, তবে বাংলাদেশ দল এখন শ্রীলঙ্কায় টেস্ট ম্যাচ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল। লঙ্কানদের বিপক্ষে ২৪ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজ। কিন্তু কোয়ারেন্টিন জটিলতায় সেই সিরিজ স্থগিত হয়ে গেছে।

 

যদি সিরিজ চলমান থাকতো, তবে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচ থেকেই সাকিবকে দলে পেত বাংলাদেশ। এমন ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছিলেন বাংলাদেশে ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনও।

 

এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরতে সাকিবকে অপেক্ষায় থাকতে হবে আগামী বছরের শুরু অবধি। জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সফরের কথা রয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের। সেই সিরিজটি হলে ফের লাল-সবুজের জার্সিতে মাঠ মাতাবেন এই অলরাউন্ডার।

 

তবে ক্রিকেটে ফিরতে সাকিবকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে না খুব বেশি। মধ্য নভেম্বরে বিসিবি আয়োজন করছে পাঁচ দলের টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট। সেখানেই দেখা যাবে সাকিবকে। এমনও হতে পারে, একটি দলের নেতৃত্ব থাকবে সাকিবের কাঁধে।

সাকিব যে টি-টোয়েন্টিতে খেলবেন, তা জানিয়ে রেখেছেন বিসিবি সভাপতি।

 

সাকিবের ফেরার প্রস্তুতি
এক বছর ধরে ক্রিকেটের বাইরে থাকা সাকিব আল হাসানের ব্যাটিং-বোলিংয়ে মরচে ধরলো কী-না, সেটা এক বড় প্রশ্ন। একসময়কার বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার যতোক্ষণ না মাঠে প্রতিযোগিতায় ফিরছেন, ততোক্ষণ এ নিয়ে কথা বলা বিপদের। কিন্তু নিজেকে প্রস্তুত করতে সাকিবের চেষ্টায় কোনো কমতি ছিল না।

 

গেল এক বছরের বেশিরভাগ সময়ই সাকিব ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে, পরিবারের সাথে। গেল মার্চে তার স্ত্রী দ্বিতীয় কন্যা সন্তানের জন্ম দেন।

 

সেপ্টেম্বরের শুরুতেই দেশে ফিরে অনুশীলনে মনোযোগ দেন সাকিব। আইসিসির নিয়ম মেনে বিকেএসপিতে ‘ক্লোজডোর’ অনুশীলন করেন তিনি। তার লক্ষ্য ছিল শ্রীলঙ্কা সফরে দ্বিতীয় টেস্টের দলে ফেরা।

 

কিন্তু সফরটি স্থগিত হয়ে যাওয়ায় এ মাসের শুরুতে আবারও যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান সাকিব। তবে এবার সেখানে গিয়ে অনুশীলন বন্ধ রাখেন নি তিনি। জাতীয় দলের ফিজিওর সূচি মেনে চালিয়ে যাচ্ছেন অনুশীলন। বিশেষ করে ফিটনেস ঠিক রাখার দিকেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ তার।

 

বিসিবি কর্তারা জানিয়েছেন, নভেম্বরের শুরুতেই সাকিব দেশে ফিরবেন, প্রস্তুত হবেন টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের জন্য।

 

চ্যালেঞ্জ আছে, চ্যালেঞ্জ নেই
সাকিব আল হাসানের ফেরার পর পথটা সহসাই কন্টকমুক্ত হবে না। এক বছরের বিরতির পর প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ আছে তার।

 

যে ‘ভুলে’ নিষিদ্ধ, সেই ভুল থেকে কতোটা শিক্ষা নিয়েছেন, সেটাও আছে আতশি কাচের নিচে।

 

কিন্তু একটা দিক দিয়ে সাকিব নির্ভারও। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ক্রিকেটে ফিরেই তিনি জাতীয় দলে প্রবেশের দরজা উন্মুক্ত পাচ্ছেন। সেখানে কেউ নেই তাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর!

 

গেল এক বছরে সাকিবের মতো এমন কাউকেই পায়নি বাংলাদেশ, যিনি সাকিবের অভাব অনুভব হতে দেন নি (বা দেবেন না)। সুতরাং জাতীয় দলে জায়গা নিয়ে আপাতত নিশ্চিন্ত সাকিব।

শেয়ার করুন :